ছোট গল্প

অনেকক্ষণ ধরেই খেয়াল করছিলাম,পাশের সিটের বাচ্চা ছেলেটা একটা মুচকি হাসি দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে ।বয়স ৭/৮ বছরের বেশী নাহ্ ।হাতে ব্যান্ডেজ,হাড়ভাঙ্গা যথাসম্ভব ! তারসাথে অভিভাবক বলতে একটা কমবয়স্ক মহিলা।দুজনের মধ্যে কথােপকথন চলছে,বুঝতে পারলাম ঠিকই যে আলোচনার বিষয়টা আমি ।ছেলেটার দিকে তাকালাম এবার। এবার ছেলেটা বললাে,’আপনাকে দেখতে না,অবিকল আমার মায়েরই মতো !’
মায়াবী ,কথা বলার ধরণ ।কিন্তু অদ্ভুতরকম শীতল। মুচকি হেসে বললাম,’জানো কী?আল্লাহ্ তা’আলা একই রকম বৈশিষ্ট্য দিয়ে একাধিক মানুষ পাঠান। তাই কিছু মিলে যায় মাঝেমধ্যে।’
সে বললো,’কিন্তু উনি একদম একই রকম!ফুপ্পি তাইনা??’
পাশে বসা মহিলাটা তবে ছেলেটার ফুপু্ । তার ফুপু তাকে বললো ‘এভাবে কাউকে বলতে নেই ,বাবা ।’
ছেলেটা চুপ হয়ে গেল । আমি তাকে জিগাসা করলাম,হাতে কী হয়েছে ছোট?
নির্বিকার ভঙ্গিতে তার জবাব,মনে নেই তো !
আমি বললাম,ব্যাথা নিশ্চয়ই খুব !কান্না তো করেছো অনেক,নিশ্চিত !!
সে বললো,আমার কোন ব্যথা নেই আন্টি । কাঁদে কীভাবে ?
আমি বললাম, বাহ্ !! এইতো সুপারম্যান !কিন্ত খোকা,মাঝেমাঝে কাদবে। শরীর সুস্থ থাকবে তাতে ।
ছেলেটা বললো,কান্না তো আসেনা !ঐ যে ওরা সেদিন মাকে ঘরে এনে বললো মরে গেছে তোমার মা ।গিয়ে দেখলাম,মায়ের মুখটা নষ্ট হয়ে গেছে! গাড়ি নাকি পিষে দিয়েছে ! সেদিন থেকে আমার আর ব্যাথা লাগেনা ,কান্নাও আসেনা ।
ঘটনা আন্দাজ করতে পেরে তার ফুপুর দিকে তাকালাম । তিনি বললেন,’রোড এক্সিডেন্ট, বোন ।সেই থেকে ছেলেটার মাথা কেমন হয়ে গেলো। কথাও বলে না,এই এতোদিনে আপনাকে দেখে এটুকু বললো ! দেড় বছর ধরে একদম বোবা ! আপনার মুখটা দেখে মনেহয় ওর মার কথা মনে হলো ,আহারে মা মরা ছেলেটা !!
কথাটায় ভেতরটা কেমন যেন ছ্যাত করে উঠলো । মনে পড়তে লাগলো নিজের বহু কথা ।
মহিলাকে বললাম,এভাবে কখনও বলবেন না আর । নেগেটিভ ইমপ্রেশন ক্রিয়েট হয় জীবনের প্রতি ।
মহিলা জিগেস করে উঠলেন,আপা কী সাইকিয়াট্রিস্ট,না?
জবাবে বললাম,নাহ্। ছাত্রী। আর কথাটা বললাম আপনাকে নিজের জীবন থেকে পাওয়া শিক্ষা থেকে ।
ছেলেটা চেয়েই রইলো । তাকে বললাম,দুনিয়াতে সবারই যদি মা থাকতো আব্বু,তবে মা জিনিসটার আর আলাদা কদর থাকতো নাহ্ ।
সে জিগেস করলো,তোমার ও কী আমার মত ?মা কে গাড়ি পিষে দিলো?
আমি বললাম,জানা নেই বাবা । ২ বছর বয়স,কীইবা বুঝি বলো?
ও আবার বললো,কীভাবে জেনেছো??
স্মিত হেসে জবাবে বললাম,ওই যে ! সবাই দেখলেই বলতো,আহারে,মা মরা মেয়েটা !
তারপর কত কত স্বান্তনা !!
মনে মনে ভাবলাম,আর কোন কিছু টিকুক বা না টিকুক,মা জিনিসটাকে দীর্ঘায়ু নিয়ে আসতে হয় জগতে।
মৃত মায়েরা যদি দেখতে পেতেন,তার অবর্তমানে সন্তানটাকে কতটা সিজ্জত পোহাতে হয় !তবে তাদের কেবল একটাই চাওয়া থাকতো ওপরওয়ালার কাছে!’আমাকে আবার
দুনিয়াতে ফিরিয়ে দাও খোদা !কেবল আমার সন্তানটার জন্য !!’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *