বাবা

কবিতা

বাবা,তুমি এমন কেন?
এত ভালোবাসো কেন?

উঁচু খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠা যতটা কষ্ট,
যতটা যন্ত্রণা হয় তীব্র রোদে কাঠ-ফাটা জমিনে-
লাঙ্গল দিয়ে হাল চাষ করা!
তার চেয়েও হাজার গুণ চাপা কষ্ট নিয়ে-
আগলে রাখো বুকের ভেতর।

তুমি ফজরের আগে ঘুম থেকে উঠে লেগে পড়ো কাজে।
তুমি ক্ষুধার্ত থেকেও সবার আগে খাইয়ে দাও আমাকে।
কখনো দেখেছি তুমি ঘামতে ঘামতে ক্লান্ত হয়ে-
বসে পড়েছো মাটিতে,শরীরটা আর চলছেনা।
কতটা বছর কেটেছে তোমার-
সুখী হওয়ার স্বপ্ন দেখে!
পূরণ করতে পারি নি তা।

চার বছর আগের কথা;আমার জন্য তুমি-
পেটে অসহ্য যন্ত্রণা নিয়েও-
মেস ভাড়ার টাকাটা দিলে।
আমাকে কিছুই জানাওনি!

মাকে বলতে,একদিন আমি অনেক বড় হবো।
সবাই আমার প্রশংসা করবে,আমাকে নিয়ে কথা হবে-
চায়ের দোকানগুলোতে।

আমার স্পষ্ট মনে আছে যখন শুনলে-
আমি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিব,
তুমি ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলে আমার খরচ যোগানের জন্য।
সে বছর চরে কত ভালো ফসল ফলিয়েছিলে!
কত্ত টাকা দিয়েছিলে! মনে আছে?

আমার মনে আছে,কোন একদিন হাল চাষ করতে করতে-
মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিলে তুমি।
আমায় ফোন করো নি,
আড়ালেই রেখেছিলে সব ব্যাথা।

ফেব্রুয়ারীর একুশ তারিখ,হাসপাতালে নিয়েছিলাম জোর করে।
মনে আছে বাবা?সেদিন তোমার জন্য কত কেঁদেছিলাম?
বিধাতা এমন ভাবে তোমায় দূর্বল করে দিবেন কখনো ভাবিনি।

সন্ধ্যায় রিপোর্টে এসেছিল-
তুমি সন্তানের জন্য,বিলিয়ে দিয়েছো নিজেকে।
কখনো নিজেকে নিয়ে ভাবোনি,ভেবেছো সন্তানের সুখ।
তাই সেদিন আমার কষ্ট ভরা বুক নিয়েও হেসেছিলাম।
তুমিই তো শিখিয়ে দিলে,কিভাবে বিপদেও হাসিমুখ রাখতে হয়?
তুমি আমার হাসিমুখে, তোমার বিপদ দেখতে পেয়েছিলে,
বুকে টেনে বলেছিলে- আমার জন্য চিন্তা করিস না।
তোর মা’কে সুখে রাখিস।বাবা,কান্না চাপিয়ে-
রাখতে পারিনি তখন।
সেদিন আমার আগ্রহে ডাক্তার মুখ খুলে বলেছিল-
তোমার ক্যান্সার হয়েছে!তুমি আর বাঁচবেনা।

বিদ্যুৎ স্পর্শ করলে যে অনুভূতি,মরুভূমিতে যে হাহাকার-
আমি তা স্পষ্ট অনুভব করছিলাম।
তবুও তুমি ভেঙ্গে পড়োনি,তুমি সমুদ্রের মাঝে দাঁড়িয়েও,
সাহস দিয়েছো,শক্তি দিয়েছো।

কত রাত তোমার সাথে থেকেছি,
কোনদিন একটু শব্দও করোনি।
কোনদিন বলো নি তোমার ব্যাথা হচ্ছে!
আমি মধ্যরাতে জেগে দেখেছি,কলিজার যন্ত্রণায়-
পেটে বালিশ চেপে হাটু গেড়ে উপুর হয়ে বসে আছো।
চোখগুলো নিভু নিভু আলোয় জ্বলজ্বল করছিলো।
যেন ঝর্ণা বেয়ে পানি আসছে!

সেদিন বুকে কেমন যেন হাহাকার ছিল,
আমাদের জন্য এত করলে,কি দিলাম শেষে?
কিছুই দিতে পারিনি,দিয়েছি শুধু হাজারো কষ্ট!
সেই কষ্ট যখন তোমাকে ঘিরে ধরেছিল,তখন তুমি-
আমাকে না জানিয়েই ভোর বেলায় বিদায় নিয়েছিলে!
আর একটু থাকলে কি হতো?দুটো কথা তো বলতে পারতাম।

ঘর যেমন চালা ছাড়া মূল্যহীন, নদী যেমন পানি ছাড়া অসহায়,
বই যেমন লেখা ছাড়া প্রাণহীন,কলম যেমন কালি ছাড়া ফেলনা!
আমি সেদিন তেমনি অনুভব করেছিলাম,আজও করি।

বাবা নামক ছাতাটা যেদিন মাথা থেকে সরে গিয়েছিল-
সেদিন বুঝেছিলাম রোদের কি তাপ!ঝড়ের কি গতি!

জানো বাবা,তোমার ছেলে আজ তোমার স্বপ্ন পূরণ করেছে।
তোমার কষ্ট বৃথা যায় নি,তোমার সম্মান বেড়েছে।
চায়ের দোকানগুলোতে তোমার ছেলের কথা হয়।

আমি তো তোমার বুকে পা দিয়ে সফল হয়ে গেলাম,
তোমাকে কি দিলাম?কিছুই পারি নি দিতে!
যে বাবা,বিসর্জন দেয় তার সুখ,
যে নিজেকে বিলিয়ে দেয় তার সন্তানের সুখের তরে,
সে বাবা নয়,সে মহামানব,সে বীর।
আমার চোখে তুমি – পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নায়ক।

@— মিলন শেখ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *