ছোট গল্প

ছেলেটার নাম ভাস্কর ।পুরোটা হলো ভাস্কর চৌধুরী (অসীম )। প্রথম টা ভালো ,মাঝের টা বংশীয় আর শেষের টা ঠাকুরদার দেয়া নাম । বন্ধু মহলে সে ভাস্কর হিসেবে পরিচিত ছিল ,এখনো আছে ।

চাকরি ক্ষেত্রেও ঠিক তাই । 

আসলে “নাম ” মানুষ কেন দেয় ? আসলেই কি এই নাম কোন পরিচয়ের জন্য ? নাকি ধরে চিহ্নিত করার জন্য ? নাকি পুরোটাই বংশীয় কিংবা সমাজের সহজাত প্রবৃত্তির ধাপ্পা? 

মাঝে মাঝে অফিস থেকে ফিরে পৈত্রিক বাড়ির ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরিয়ে টানতে টানতে চিন্তা করে বিষয় টা ।মাঝে মাঝে ওর ব‌উ কলি এসে ওকে চা দিয়ে যায় ।

তখন চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ভাস্কর ভাবে “নাম” বলতে আসলে কিছুই নেই …..

এই দুনিয়ায় কাগজ‌ই বড় ।

ভাস্কর আর কলির বিয়ে হয়েছে প্রায় মাস তিনেক হবে ।ঈষৎ প্রেম ,ঈষৎ পারিবারিক সম্মতিতে ওরা সাত পাকে বাঁধা পড়ে যায় একে অপরের সাথে ।

কলি মেয়েটা ভালো ।সহজ , সরল বাঙালি মেয়ে যাকে বলে । সকাল হলে পূজো দিয়ে স্বামীর দীর্ঘায়ু কামনা করে ঘরের কাজে লাগে , আবার সন্ধ্যায় পূজো করে পুরো বাড়িতে ধুপ জ্বালে ।

বাড়িতে অবশ্য ওরা তিনজন থাকে । ভাস্কর ,কলি আর কলির দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের মেয়ে ঝর্ণা ।

ঝর্ণা বাড়ির কাছের একটা স্কুলের মাধ্যমিকে পড়ে ।বাড়ির কাজে ও কলিকে সাহায্য করে আবার অনেক সময় ভাস্কর বাড়ি ফিরে দেখতে পায় কলি ঝর্ণাকে পড়াশোনা বুঝিয়ে দিচ্ছে ।

এইভাবেই চলছে সব কিছু । দৈনিক একটা রুটিনের মধ্যে দিয়ে । ভাস্কর যদিও কম কথা বলে তবে কলি ঝর্ণাকে বলে ,” যারা কম কথা বলে তারা সত্যি মন থেকে ভালবাসতে জানে , খেয়াল রাখতে জানে ।”

ঝর্ণা কথা গুলো মন দিয়ে শোনে আর ভাবে ওর স্কুলের ছেলেবন্ধুটি এরকম নয় কেন?

একদিন ভাস্কর অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে ঐ ব্যালক্যানি তে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরিয়েছে কি ধরাই নি ,কলি পেছন থেকে এসে ভাস্করের ঠোঁটের সিগারেট টা নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলো ।

ভাস্কর খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেও কলির চোখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো ঘটনা আসলে কি !

কিন্তু যখন ব্যর্থ হলো বুঝতে তখন কলি নিজে থেকেই বললো ,” নতুন অতিথি কিন্তু আসছে ,তাই বাড়িতে সিগারেট বন্ধ ।এই সিগারেট তোমার টেনশনের মাথার সাথে সাথে আমার বাচ্চার মাথাও খেয়ে ফেলতে পারে ! “

ভাস্কর কিছু টা সময় চুপ করে থেকে কলি কে জড়িয়ে ধরলো ।আজ সে অনেক খুশি যে সে বাবা হতে চলেছে।

হয়তো সব ছেলেরাই বিয়ের পর এরকম সংবাদে খুশি হয় ….

পরদিন ভাস্কর কলি কে নিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে আনলো । সবকিছু ঠিক আছে‌। চিন্তার কোন কারণ নেই ।তবু ভাস্কর বাড়িতে একজন বামুন ( রান্নার লোক ) আর একজন ফাইফরমাশ খাটার চাকর ঠিক করলো ।আর ঝর্ণাকে দ্বায়িত দিলো সবসময় কলির যেন খেয়াল রাখে ।

সূর্যের উঠা ডোবার মধ্যে দিয়ে যখন ডক্টরের অনুমান করা দিন এলো , হাসপাতালে ভর্তি কলি।

ভাস্কর ডাক্তারের অনুমান করা দিনের কয়েক দিন আগেই কলি কে হাসপাতালে এনেছিল কিন্তু ভাগ্যদেবতা হয়তো অন্য কিছু চেয়েছিলেন ।

কলি তার প্রথম সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যু কে আলিঙ্গন করলো ।ডাক্তার রা অবশ্য ভাস্কর আর কলির ছোট্ট নবজাতক মেয়ে শিশু টিকে বাঁচতে পেরেছে।

কলি মারা গেছে তিনমাস হলো । বাচ্চাটা ঝর্ণার কাছেই মানুষ হচ্ছে । ভাস্কর হয়তো কঠিন মানুষ দেখে বাইরে দিয়ে ঠিক থাকলেও গভীর রাতে ব্যালক্যানিতে দাঁড়িয়ে পুরোনো স্মৃতি বিজড়িত ঘটনা গুলো মনে করে ।

সময় সবচেয়ে বড় ঔষধ ।আস্তে আস্তে বাহ্যিক দৃষ্টিতে সবকিছু স্বাভাবিক হলে পারিবারিক গুরুজনেরা ঝর্ণার সাথে ভাস্করের বিয়ের কথা তুললো । ভাস্কর প্রথম দিকে না বললেও সন্তানের দিকটা চেয়ে রাজি হলো । তাছাড়া বাচ্চাটা জন্মের পর থেকেই তো ঝর্ণার কাছে মানুষ হচ্ছে ,ঝর্ণাও বাচ্চার দিকে তাকিয়ে প্রস্তাব টা ফেলতে পারলো না ।

বাচ্চাটা এখন আর তেমন ছোট নেই । বাড়ির সবাই মিলে ডাকনাম দিছে ছোটন ।ভাস্কর সিটি কর্পোরেশন অফিস থেকে ছোটনের জন্ম সনদ নেয়ার সময় ওর মায়ের নামের জায়গায় লিখে দিলো স্বর্গীয় কলি রাণী দেবী।

জন্ম সনদ টা দেখে ঝর্ণা মোটেও রাগ করলো না । উল্টো ভাস্কর কে জড়িয়ে ধরে বলল ,” আপনি , আপনার বাবার মতো ভুলটা করেন নি । পৃথিবীর বুকে মানুষের পরিচয় তো এই কটা কাগজেই লেখা থাকে , সেখানে কেন‌ই বা মিথ্যা টা লিখবেন বলুন ?”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *